ওমানে মর্মান্তিক মৃত চার সহোদরের জানাজায় হাজার মানুষের ঢল
রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) : ওমানে মর্মান্তিক মৃত চার সহোদরের জানাযায় হাজার মানুষের ঢল নেমেছে। গত ১৯মে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরে ওমান থেকে লাশ আসার পর পরিবারের পক্ষে ৪ সহোদরের লাশ রাঙ্গুনিয়ার সাংসদ হুমাম কাদের চৌধুরী এমপি গ্রহন করেন। গ্রহনের পর গতকাল বুধবার রাঙ্গুনিয়ার লালানগর ইউনিয়নের বন্দারাজার এলাকায় ভোর সকালে পৌছলে সাথে সাথে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। দলে দলে লোকের সমাগম হতে থাকে। সকাল থেকে লালা নগর উচ্চ বিদ্যাদালয় মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে জনসমুদ্রের রূপ নেয়। ১১টায় জানাযা শুরুর পূর্বে প্রশাসন, পুলিশ, রাজনীতিবিদসহ এলাকায় কয়েক হাজার মানুষের সমাগমে লোকে লোকারণ্যের পরিনত হয়। সকাল ১১টায় জানাযা শেষে ৪ সহোদরের লাশ বন্দারাজার পাড়া জমে মসজিদের পাশে ৪ ভাইকে পাশাপাশি কবরে শুয়ে দিয়ে দাফনের কাজ শেষ হয়।
উল্লেখ্য, গত ১৩ মে ওমানে গাড়ির ভেতর বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের বিষক্রিয়ায় মর্মান্তিক মৃত্যু হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলার একই পরিবারের চার প্রবাসী ভাইয়ের। নিহতরা হলেন রাঙ্গুনিয়া লালা নগর ইউনিয়নের বন্দারাজার পাড়ার মৃত আবদুল মজিদের সন্তান। নিহতরা হলেন রাসেদুল ইসলাম (৪০), শাহেদুল ইসলাম (৩২), সিরাজুল ইসলাম (২৮) ও শহিদুল ইসলাম (২২)। একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর বান্দারাজার পাড়া এলাকায় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। নিহত বড় সন্তান রাসেদুল ইসলামের রেখে যাওয়া তিন বছর বয়সী এক সন্তান ও তিন মাস বয়সী শিশুকে ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্বজনরা।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় ছিল মা ফরিদা বেগম (৫৫) সন্তানদের মৃতের খবর জানানো হয়নি অবদি পর্যন্ত। তিনি শুধু জানেন, তার ছেলেরা অসুস্থ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
এদিকে কিছুক্ষণ পর পর মা জ্ঞান হারাচ্ছেন। ছেলের অসুস্থতার কথা শুনে। একমাত্র জীবিত ছেলে এনামুল ইসলাম (২৫) মাকে কোনভাবে সান্ত্বনা দিয়ে রাখছেন।
অবশেষে আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরে মরদেহ পৌছার পর, পরিবারের পক্ষে রাঙ্গুনিয়ার সাংসদ হুমাম কাদের চৌধুরী এমপি লাশ গ্রহণ করে রাঙ্গুনিয়ার গ্রামের বাড়িতে লাশ সরকারি খরচে পৌছান।
মরদেহ হস্তান্তরের সময় হুমাম কাদের চৌধুরী, লাশবাহী গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
সাংসদ আরো জানান, প্রথমদিকে ঘটনাটি সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে ধারণা করা হলেও পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া যায়, গাড়ির ত্রুটিপূর্ণ এয়ারকন্ডিশনিং (এসি) সিস্টেম থেকে নির্গত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের কারণেই চার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে।
বিদেশ থেকে মরদেহ দেশে আনতে দ্রুত
সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এ বিষয়ে ওমানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রিয়ার অ্যাডমিরাল আজিম-এর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টার কারণেই এত দ্রুত মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এজন্য তিনি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কেও ধন্যবাদ জানান।
এলাকায় খোজ নিয়ে জানাযায়, একসময় অভাব-অনটনের সংসারে কৃষিকাজ করেই কোনোমতে জীবনযাপন করতেন তাদের বাবা। ছোট ছেলে শহিদুল ইসলামের জন্মের মাত্র তিন বছর পরই মারা যান তিনি। এরপর বড় দুই ছেলেকে তেমন লেখাপড়া করাতে পারেননি মা ফরিদা বেগম। সংসারের হাল ধরতে প্রায় ১২ বছর আগে সবার বড় রাসেদুল ইসলাম পাড়ি জমান ওমানে। পরে ধীরে ধীরে ছোট ভাই শাহেদুল ইসলামকেও নিয়ে যান সেখানে।
দুই ভাই মিলে ওমানে একটি কার ওয়াশের ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা কিছুটা দাঁড়িয়ে গেলে পর্যায়ক্রমে ছোট দুই ভাই সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলামকেও নিয়ে যান। পাঁচ ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল প্রবাসের আয় দিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর। প্রায় পাঁচ বছর আগে নতুন জায়গা কিনে পরিবারের জন্য একটি বাড়ির কাজও শুরু করেন তারা। তবে সেই ঘরের নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি।
এরই মধ্যে ছয় মাস আগে দেশে এসে বিয়ে করেন শাহেদুল ইসলাম। অন্যদিকে সিরাজুল ইসলামেরও দেশে এসে বিয়ে করার পরিকল্পনা ছিল। সে উদ্দেশ্যে ছোট ভাই শহিদুল ইসলামকে নিয়ে আগামী ১৫ মে রাতে দেশে ফেরার টিকিটও কাটা হয়েছিল।
স্বজনরা জানান, দেশে ফেরার আগে কেনাকাটার উদ্দেশ্যে ১৩ মে বুধবার দুপুরে চার ভাই একটি গাড়ি নিয়ে বের হন। পথে একটি পাকিস্তানি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খান তারা। পরে কেনাকাটার জন্য বের হওয়ার পর হঠাৎ অসুস্থতা অনুভব করলে ওমানের মুলাদ্দা এলাকায় একটি হাসপাতালের সামনে গাড়ি পার্ক করেন।
কিন্তু সেখানেই ঘটে বিপর্যয়। কোনোভাবেই গাড়ির দরজা খুলতে পারছিলেন না তারা। এসময় ছোট ভাই শহিদুল ইসলাম বাংলাদেশি একটি ভয়েস গ্রুপে ২৪ সেকেন্ডের একটি ভয়েস বার্তা পাঠান। তিনি এইভাবে বলেন" পারভেজ তুরা কডে। তাইলি তুই এক্কে না এডে আই। আরা চারও জন গারিত্তুন লামিন ন-পারিন। আর বদ্দা-রে আঁরা ডাক্তারের এ-ডে লই আইসসি, গারি তাগি-লি হলিক্লিনিকে লয় আইতো" কণ্ঠে ছিল আতঙ্ক আর ক্লান্তি। এই ছিল তাদের জীবনের শেষ আর্তি।
পরে বুধবার সকাল ৮টার দিকে স্থানীয়রা গাড়ির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় দেখে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে গাড়ি থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে তাদের মৃতদেহের ডাক্তারী পরীক্ষা ও সব প্রক্রিয়া শেষ করে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় লাশ দেশের গ্রামের বাড়িতে পৌছে।

Post a Comment